সৌরভ দেব (১৮) অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার ভাই সায়নের দেওয়া জন্মদিনের উপহারের জন্য। ৬ই এপ্রিল তার জন্মদিন, এবং সে জানে সায়ন (১৭) তাকে কী দেবে—প্রতি বছরই সে নতুন একটি নোটবুক আর কিছু পেন্সিল উপহার পায়। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধকতার সাথে বেড়ে ওঠা সৌরভ তার চোখে দে খা জগৎকে কল্পনাময় চিত্রকলার মাধ্যমে প্রকাশ করে।
সৌরভ আসামের কাছাড় জেলার কাটিগোরা এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা-মা শৈলেন কুমার দেব ও প্রতিমা দেব, দুজনেরই বয়স ৪৬। শৈলেন একজন দিনমজুর, কখনো প্লাম্বিং তো কখনো ইলেকট্রিকের কাজ করে দিনে দিনে উপার্জন করেন মাত্র ₹৬০০০-৭০০০। প্রতিমা সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলান, বিশেষ করে চার ছেলের দেখভাল করেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যত্ন দরকার সৌরভের। দারিদ্র্যের কষ্ট থাকা সত্ত্বেও (একটি মাত্র বড় ঘরে একসাথে থাকে), শৈলেন ও প্রতিমা তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চার ভাইয়ের মধ্যে সায়ন বর্তমানে একাদশ শ্রেণির ছাত্র, সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনায় মুগ্ধ। ভবিষ্যতে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতে চায় সে। সঞ্জীব (১৫) মেকানিকস নিয়ে পড়তে আগ্রহী, আর ছোট ভাই সুমিত (১৩) এখনো তার স্বপ্নের দিশা খুঁজছে।
সৌরভের জন্মগতভাবেই কিছু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে—তার পায়ের দুটি আঙুল আর হাতের তিনটি আঙুল জোড়া। তার চলাফেরা ও হাতের সমন্বয় প্রক্রিয়া বরাবরই দুর্বল ছিল। সে হাঁটতে শিখেছিল পাঁচ বছর বয়সে, কথা বলতে শিখেছিল সাত বছর বয়সে। ২০১৪ সালে যখন দেশবন্ধু বিদ্যানিকেতন নামে একটি স্থানীয় ক্লাব প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করেছিল, তখনই সৌরভের একটি IQ পরীক্ষা হয়। তার স্কোর ছিল ৪৬, এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে সে যুধিষ্ঠির সাহা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র, কিন্তু তার শিক্ষকরা তাকে প্রতিদিন স্কুলে আসতে নিরুৎসাহিত করেন। তাদের যুক্তি, অন্য ছাত্ররা তাকে হয়রানি করতে পারে। এমনকি, তাকে পরীক্ষাতেও বসতে দেওয়া হয় না।
সায়ন শুধুমাত্র সৌরভের ভাই নয়, সে তার পথপ্রদর্শক, অভিভাবক এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সৌরভ যখন ছোটবেলায় কথা বলতে পারতনা, তখন সায়নই তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল কথা বলার জন্য। প্রতিমা বলেন, "সায়ন যখন মাত্র চার বছরের, তখনও সে সৌরভের সঙ্গে অনর্গল কথা বলত। ওর প্রচেষ্টাতেই সৌরভ কথা বলতে শুরু করেছিল।" সায়ন তার পড়াশোনায় সাহায্য করে, ছবি আঁকার সময় কম্পোজিশন ও রঙের ভারসাম্য ঠিক করতে সাহায্য করে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সে নিশ্চিত করে যে সৌরভ কখনো একা অনুভব না করে।
সায়ন জানায়, সৌরভ প্রাণীদের খুব ভালোবাসে—ছাগল, গরু, রাস্তার কুকুর—সব প্রাণীর প্রতিই তার গভীর সহমর্মিতা। আহত কোনো প্রাণী দেখলেই সে যত্ন নিয়ে তার ক্ষত সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে।
ছোটবেলা থেকেই সৌরভ শিল্পে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। যখন ভাষা তাকে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তার পেন্সিলই কথা বলেছে। পড়ার জন্য কেনা খাতাগুলোও শীঘ্রই তার আঁকা ছবিতে ভরে যায়। কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তার কল্পনাশক্তিই তার শিক্ষক। প্রতিমা একসময় তাকে আঁকার ক্লাসে ভর্তি করানোর কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু তাদের আর্থিক বাস্তবতা সে স্বপ্নকে ভেঙে দিয়েছে।
"যদি আর্থিক সহায়তা আসে," প্রতিমা বলেন, "আমরা একটা ভালো ঘর তৈরি করতে পারব, ছেলেদের ভালোভাবে পড়াশোনা করাতে পারব, আর হয়তো সৌরভ তার স্বপ্নের শিল্পী হতে পারবে।"
সায়ন, যে তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে, বলে, "আমি আমার পরিবারকে ভালোবাসি, আর আমি যা কিছু করার দরকার হবে, করব, যাতে আমরা সবাই একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।"
সঠিক সহায়তা পেলে, সৌরভের হাত একদিন এমন শিল্প সৃষ্টি করবে যা তার না বলা গল্পগুলোকে তুলে ধরবে।