জয়সাল এ (৩০) কম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। তিনি প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘সক্ষম’ ও প্রতিবন্ধী—সবার জীবনে যে সুবিধা আনা সম্ভব, তাতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। কেরালার মালাপ্পুরম শহরের Ability Foundation for the Disabled-এ কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এমন অ্যাপ তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী (VI) ব্যক্তিদের জীবনকে আরও সহজ করে তুলবে। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষাজীবনে সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন সমস্যাই তাঁকে এই কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে।
জয়সালের শিক্ষাজীবন সহজ বা সরল ছিল না। তিনি মালাপ্পুরম জেলার মোরায়ুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবা আলি একজন দিনমজুর, যিনি কুয়ো খননের কাজ করেন (কেরালায় এখনও খোলা কুয়ো রয়েছে)। তাঁর মা সাফিয়া একজন গৃহিণী। তাঁর এক বড় ভাই ফয়সাল এবং দুই ছোট বোন রহমত ও মুবিনা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি একটি সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি রহমানিয়া স্কুলে ব্রেইলের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
জয়সালের একজন বড় বোন ছিল, মুনথাসা। তাঁর সঙ্গে জয়সালের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছি ল। তিনি জয়সালকে স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং পড়াশোনায় সাহায্য করতেন। জয়সাল যখন সপ্তম শ্রেণিতে এবং মুনথাসা দশম শ্রেণিতে পড়ছিলেন, তখন মুনথাসার রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। জয়সাল মনে করেছিলেন, বোন তাঁর জন্য এতদিন যে সাহায্য ও সমর্থন করেছেন, তার ঋণ তাঁকে শোধ করতে হবে। তাই তিনি পড়াশোনা বন্ধ করে বোনের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর যত্ন নেওয়ার জন্য নিজের সময় উৎসর্গ করেন।
কিন্তু জয়সাল শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেননি। তিনি বলেন, “আমি স্বভাবতই কৌতূহলী; পড়াশোনার প্রতি আমার সবসময়ই আগ্রহ ছিল।” সমমানের শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে তিনি কেরালা স্টেট বোর্ড থেকে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করেন। তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সেও আবেদন করেছিলেন, কিন্তু কোর্সটি তাঁর জন্য উপযোগী বা সহজলভ্য না হওয়ায় তিনি সেখানে ভর্তি হতে পারেননি। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি পালাক্কাডের ভিক্টোরিয়া কলেজে ইংরেজি বিষয়ে বি.এ. পড়েন। লেখার সহায়ক ব্যক্তি বা স্ক্রাইব পাওয়ার সমস্যার কারণে তিনি সময়মতো পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।
তিনি স্মরণ করে বলেন, “অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষায় হাতে লিখে কাজ করতে হতো বলে আমার নম্বর প্রভাবিত হয়েছিল। আমার বিশ্বাস, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এগুলো ডিজিটালভাবে সহজলভ্য হওয়া উচিত।” এই বাধাগুলি সত্ত্বেও পরে তিনি অন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে বি.এ. সম্পন্ন করেন।
জয়সালের সবসময়ই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল। দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে স্কুলে ফুটবল খেলতে না পারায় তাঁর আফসোস ছিল। কিন্তু এখন তিনি মালাপ্পুরম জেলা ব্লাইন্ড ক্রিকেট দলের একজন সদস্য! কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাঁর আরও একটি নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি ইউটিউব ভিডিও দেখে কো ডিং শেখা শুরু করেন। এছাড়াও তিনি Jyotirgamaya Foundation-এর মাধ্যমে একটি উন্নত কম্পিউটার কোর্স করেন এবং Ability Foundation-এর একটি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে Linux শেখেন। প্রযুক্তি তাঁকে আকৃষ্ট করতে থাকে এবং তিনি দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
বর্তমানে তাঁর প্রধান প্রকল্প হলো AI-ভিত্তিক একটি টুল তৈরি করা, যার নাম Malayalam Typing Tutor। এটি যে কাউকে স্বাধীনভাবে মালয়ালম ভাষায় টাইপ করা শিখতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “আমি এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছি, যেখানে দৃষ্টিসম্পন্ন এবং দৃষ্টিহীন—উভয় ব্যক্তিই একই অন্তর্ভুক্তিমূলক টুল ব্যবহার করে মালয়ালম ভাষায় টাইপ করা শিখতে পারে। টাইপ করা শেখার সময় আমি নিজে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছিলাম, সেখান থেকেই এই ধারণাটি এসেছে।”
এই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে একজন শিক্ষানবিশ ধাপে ধাপে শিখতে পারবে যে মালয়ালম বর্ণমালার কোন অক্ষরের সঙ্গে কোন কী-সমন্বয় বা key combination যুক্ত। তারা টাইপ করার অনুশীলন করতে পারবে এবং টাইপিং পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারবে। এর মাধ্যমে তাদের টাইপ করার গতি ও নির্ভুলতা উন্নত হবে।
জয়সাল বলেন, “এই অ্যাপের প্রধান বিশেষ বৈশিষ্ট্য হবে একটি স্ক্রিন রিডারের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য, বিশেষ করে NVDA-এর সঙ্গে।” NVDA ব্যবহারকারী কোনো দৃষ্টিহীন বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে অ্যাপ ও কীবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন এবং অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই স্ক্রিনে কী লেখা রয়েছে তা পড়তে পারবেন। অনুশীলনের সময় তাঁরা বুঝতে পারবেন যে তাঁরা কোনো ভুল করছেন কি না, কারণ স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে অ্যাপটি শব্দের সাহায্যে তাঁদের প্রতিক্রিয়া বা feedback দেবে। এতে শব্দ, লাইন ও বাক্য নির্বাচন করার জন্য এবং তাঁর া যে লেখার অংশ পড়তে চান তা নির্বাচন করার জন্য বিভিন্ন shortcut key combination থাকবে।
জয়সাল Accessible Travel AI তৈরিতেও আগ্রহী। এটি এমন একটি অ্যাপ্লিকেশন হতে পারে, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজলভ্য ভ্রমণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে স্বাধীনভাবে ভ্রমণ করতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, “সহজলভ্যতা বা Accessibility-এর জন্য ব্যয়বহুল বা বিশেষ ধরনের যন্ত্রের প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়। আমি সবসময় এমন সমাধান খুঁজি, যা সাধারণ কম্পিউটার এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তির সাহায্যে কাজ করতে পারে—এমন প্রযুক্তি, যা সবার জন্য তৈরি।”