২০০৪ সালে কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পেঠবুঘ গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সইয়দ ভাট ও তাঁর স্ত্রী মেহবুবা তাঁদের প্রথম সন্তানের জন্মের পর তার নাম রাখেন ইফলা। আরবি ভাষায় ইফলা শব্দের অর্থ সাফল্য। ইফলা তখন খুব ছোট, যখন এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় লক্ষ্য করেন যে সে কোনো শব্দে সাড়া দিচ্ছে না। বাবা-মা তার কানের কাছে রান্নাঘরের বাসনপত্র ঝনঝন করে বিভিন্ন জোরে শব্দ করে তার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করেন। কিন্তু সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। যখন তাঁরা বুঝতে পারলেন যে ইফলা শুনতে পায় না, তখন তাঁরা অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে পড়েন। আর এক বছর পর যখন মেহরানের জন্ম হয়, তখন তাঁদের দুঃখ আরও বেড়ে যায়। কারণ তাঁরা জানতে পারেন যে মেহরানও একই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মেছে।
কয়েক হাজার মানুষের জনসংখ্যার একটি গ্রামে বসবাস করতেন এই দম্পতি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো ধরনের সহায়তা বা সুযোগ সম্পর্কে তাঁরা জানতেন না এবং শহর থেকেও অনেক দূরে থাকতেন। ফলে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেবল হতাশাই কল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা বুঝতে পারলেন যে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে হা-হুতাশ করে কাঁদার কোনো লাভ নেই। মেহবুবা প্রায়ই তাঁদের বাড়ির পাশ দিয়ে স্কুলের ছেলেমেয়েদের যেতে দেখতেন এবং স্বামীকে জিজ্ঞাসা করতেন, “আমাদের সন্তানরাও ওদের মতো স্কুলে যেতে পারবে না কেন?” তাঁর দৃঢ় সংকল্প স্বামীকেও অনুপ্রাণিত করেছিল। সংসারে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানেও সইয়দ সিদ্ধান্ত নিলেন যে যেকোনোভাবে তাঁদের সন্তানদের শিক্ষিত করবেন।
প্রথমে তাঁরা ইফলা ও মেহরানকে সর্বশিক্ষা অভিযানের অধীনে একটি স্কুলে ভর্তি করেন। এরপর প্রায় ২০০৯ সালে তাঁরা বিজবেহারায় জাভেদ আহমেদ তাকের জাইবা আপা ইনস্টিটিউট অব ইনক্লুসিভ এডুকেশন সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু সেখানে একটি বড় সমস্যা ছিল—যাতায়াত। স্কুলটি পেঠবুঘে তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ছিল। মেহবুবা প্রশ্ন করলেন, ভালো সুযোগের জন্য তাঁরা কেন শহরে চলে যাবেন না। কিন্তু সইয়দ দৃঢ়ভাবে বললেন, “ওদের এই স্কুলে পৌঁছে দেও য়ার একটা উপায় আমি বের করব, এমনকি ওদের স্কুলের ফি ও যাতায়াতের খরচ জোগাড় করতে যদি আমাকে আমার জমি বিক্রি করতে হয়, তবুও।”
সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের যাত্রাপথকে দু’ভাগে ভাগ করতে হতো। প্রথমে তাঁরা কোনো ট্যাক্সিতে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে অথবা কারও কাছ থেকে লিফট নিয়ে জেলা সদর অনন্তনাগে যেতেন। অনন্তনাগ থেকে স্কুলে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার ট্যাক্সিটি যদি তাঁরা মিস করতেন, তাহলে আবার কারও কাছ থেকে লিফট চাইতেন, অন্য কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করতেন অথবা কখনও কখনও পথের কিছুটা হেঁটেও যেতেন। এত অসুবিধা সত্ত্বেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেও সন্তানদের সহায়তা করতে পারে এমন একটি স্কুল খুঁজে পাওয়ায় দম্পতিটি নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন।
ইফলা ও মেহরান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করে। এদিকে এই দম্পতির আরও একটি কন্যাসন্তান হয়, সাবুরা। সে শুনতে ও কথা বলতে পারে। এখন তার বয়স ১৫ বছর এবং সে দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আসলে সাবুরাই তার বাবার সঙ্গে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল এবং তার ভাই-বোনদের সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছিল। সে বলেছিল, “আমাদের পরিবার ইশারার মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে।”
অষ্টম শ্রেণির পর তাঁদের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। পরিবারের এক পরিচিত ব্যক্তিরও একটি কন্যাসন্তান ছিল, যে বধির এবং কথা বলতে অক্ষম ছিল। দুই পরিবার একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয় যে তিন সন্তানকে কাশ্মীরের সবচেয়ে পুরোনো বিশেষ বিদ্যালয়—শ্রীনগরের রামবাগে অবস্থিত অভিনন্দন হোমে পাঠানো হবে। এই বিদ্যালয়টি দৃষ্টিহীনতা, বধিরতা এবং দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য। তারা সেখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে।
পড়াশোনার বাইরেও ইফলা ও মেহরানে র বিভিন্ন বিষয়ে গভীর আগ্রহ রয়েছে। খেলাধুলা ও শিল্প তাঁদের দুজনকে ভিন্ন ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে। মেহরান ব্যাডমিন্টন খেলতে খুব ভালোবাসে এবং ক্রিকেটও পছন্দ করে। অন্যদিকে ইফলা স্কেচ, ছবি আঁকা এবং ডিজাইন করতে ভালোবাসে ও এতে ভালো। তবে একটি বিষয়ে দুজনেরই প্রবল মিল রয়েছে—তারা দুজনেই চাকরি করতে চায়, বিশেষ করে সরকারি চাকরি, এবং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে চায়।
দ্বাদশ শ্রেণিই তাদের শিক্ষার শেষ ধাপ ছিল না। মেহরান ডেটা এন্ট্রির একটি কোর্স করেছে এবং জাতীয় মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ইগনু (IGNOU)-এর মাধ্যমে দূরশিক্ষায় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইফলা এক বছরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ITI) কোর্স করছে।