Icon to view photos in full screen

“আমার ইংরেজি সবসময়ই ভালো ছিল। অবসর সময়ে আমি সেটিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করি।”

জয়পুরে অনুষ্ঠিত ‘Able Summit’ নামে গ্লোবাল এডুকেশন ফেস্টের দশম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি অধিবেশনে, দর্শকেরা এক তরুণীর কাছ থেকে কয়েকটি সাইন বা ইশারা শিখেছিলেন। ‘শ্রবণক্ষম’ শিক্ষিকা ড. অদিতি মিশ্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করে ওই তরুণী মানুষকে ভারতীয় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ (ISL)-এ কীভাবে “আমার সাহায্য দরকার”, “আমি তোমাকে সাহায্য করব”, “ধন্যবাদ”, “আমি দুঃখিত” এবং “আমি তোমাকে ভালোবাসি”—এই বাক্যগুলি প্রকাশ করতে হয়, তা শেখান।
গাজিয়াবাদের ২২ বছর বয়সি সিমরান কুমারী এই প্রথম কোনো বড় মঞ্চে উঠে এত বড় দর্শকের সামনে কথা বলার সুযোগ পান। শ্রেণিকক্ষই তাঁর পরিচিত জগৎ। গত দুই বছর ধরে তিনি দিল্লির Sai Swayam Society (SSS) School for the Deaf-এ একজন বধির শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করছেন। তিনি এমন শিক্ষা দেন, যে ধরনের শিক্ষা তিনি নিজে গাজিয়াবাদের একটি সাধারণ স্কুলে পড়ার সময় পাননি।
সিমরান জন্ম থেকেই বধির। তিনি ছিলেন দুই বধির বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। তাঁর বাবা প্রদীপ কুমার (৩৬) একটি ক্যান্ডি তৈরির সংস্থায় কাজ করেন এবং তাঁর মা গীতা দেবী (৩৯) গৃহিণী।
প্রদীপ ও গীতা দুজনেই একই বধিরদের স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। প্রদীপ ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়েছিলেন এবং গীতা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। তাঁদের আরও দুই সন্তান রয়েছে, যারা শ্রবণক্ষম—হার্ষিতা (১৯), যিনি বি.এসসি পড়ছেন এবং নৈতিক (১৩), যে দশম শ্রেণিতে পড়ে।
“বাড়িতে সবাই সাইন ব্যবহার করে কথা বলে,” একজন দোভাষীর মাধ্যমে সিমরান আমাদের জানান। “একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আমরা নিজেদের মতো করে একটি সাইন ভাষা তৈরি করেছিলাম।”
অনেক বছর পর তিনি ভারতীয় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ (ISL) শেখেন।
তিনি গাজিয়াবাদের একটি সাধারণ বেসরকারি স্কুল—Santosh Shiksha Niketan Junior High School-এর হিন্দি মাধ্যম বিভাগে পড়াশোনা করেন। তাঁর বাবা-মা এবং প্রদীপের বোন তাঁকে পড়াশোনায় সাহায্য করতেন। পরে তাঁর বোন হার্ষিতাও একই স্কুলে ভর্তি হয়, তবে সে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ত। সে সিমরানের সহপাঠীদের কাছ থেকে নোট নিয়ে এসে সেগুলি সিমরানকে বুঝিয়ে দিত।
ইংরেজি ও গণিতে সিমরান ভালো ফল করতেন এবং দশম শ্রেণিতে ৭১ শতাংশ নম্বর পান। তিনি মনে করেন, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পেলে তিনি আরও ভালো ফল করতে পারতেন, কিন্তু স্কুলের অধ্যক্ষ তাঁকে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি হতে দেননি।
“বধির মানুষদের জন্য হিন্দি শেখা কঠিন,” সিমরান বলেন। “এই কারণেই আমি হিন্দিতে এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের মতো অন্যান্য বিষয়েও ভালো করতে পারিনি।”
সিমরানের মনে আছে, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি তাঁর সহপাঠীদের কয়েকটি সহজ শব্দের সাইন শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তারা তাতে আগ্রহ দেখায়নি। তাঁর একমাত্র বন্ধুকেও অন্য শিশুরা নানা কথা বলত। তারা তাকে জিজ্ঞেস করত, “তুমি ওই বধির মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছ কেন?”
কিন্তু সিমরান হাল ছাড়েননি। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠতে উঠতে তাঁর চারজন বন্ধু হয়েছিল। তিনি তাঁদের সাইন বর্ণমালা এবং ‘হ্যালো’, ‘জল’, ‘খুশি’ ও ‘খাওয়া’র মতো সহজ শব্দের সাইন শেখাতেন।
তাঁদের সাইন করতে দেখে অন্য শিশুরাও এতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কখনও কখনও ক্লাসে সবাই সিমরানের হয়ে এবং শিক্ষকের কথাও সাইন বা ইশারার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে শুরু করত। এতে ক্লাসে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিরক্ত শিক্ষক তাদের থামিয়ে দিতেন।
দশম শ্রেণির পর তিনি গাজিয়াবাদের Saraswati Shiksha Niketan Inter College-এ ভর্তি হন। সেখানে তিনি হোম সায়েন্স ও আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করেন। দ্বাদশ শ্রেণিতে তিনি ৬৩ শতাংশ নম্বর পান।
এরপর তিনি অবশেষে Noida Deaf Society (NDS)-এ ভারতীয় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শেখেন। এটি একটি এনজিও, যেখানে আট মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এই প্রশিক্ষণে কম্পিউটার, ইংরেজি এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
“আমি NDS-এ অনেক কিছু শিখেছি,” তিনি বলেন। “আমি নিজের কথা প্রকাশ করতে পারতাম। আমার মনে হয়েছিল, আমি এই সমাজেরই একজন।”
তবে NDS-এর প্রশিক্ষণ শেষ করার আগেই তাঁর কাকা তাঁকে ISL Research and Training Centre-এ ভর্তি হওয়ার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে উৎসাহিত করেন।
Diploma in Teaching ISL কোর্সে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা ছিল তাঁর জন্য একটি বড় সাফল্য এবং এতে তাঁর পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল।
তাঁর সহপাঠীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছিলেন—যেমন মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু। তখন তিনি জানতে পারেন যে প্রতিটি রাজ্য বা ভাষার নিজস্ব কিছু সাইন রয়েছে।
প্রথমে এতে তিনি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এক বন্ধু প্রীতি তাঁকে উৎসাহ দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলেন।
“ওখানে বধিরদের সংস্কৃতি, পরিচয় এবং ইতিহাসও শেখানো হয়,” সিমরান স্মৃতিচারণ করে বলেন।
ধীরে ধীরে তাঁর উন্নতি হতে থাকে। দ্বিতীয় বছরে পৌঁছে তিনি নিজের বক্তৃতা বা পাঠ নিজেই প্রস্তুত করার মতো আত্মবিশ্বাস অর্জন করেন।
২০২৪ সালে তিনি কোর্সটি সম্পূর্ণ করেন। এরপর চাকরি খোঁজার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তিনি SSS স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে যান।
সিমরান প্রথমে শুধু নার্সারি ও কিন্ডারগার্টেনের ছাত্রছাত্রীদের পড়াতেন। কিন্তু SSS-এর CEO মীরা চেতন ভাটিয়া তাঁকে উচ্চতর শ্রেণিগুলিও পড়ানোর জন্য উৎসাহিত করেন।
এখন তিনি পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির সমস্ত বিষয় এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি পড়ান। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দৃশ্যভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করেন।
সিমরান নিজেই যাতায়াত করেন। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়েছে।
অবসর সময়ে তিনি কী করতে ভালোবাসেন—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি সবসময় আমার ইংরেজি আরও ভালো করার চেষ্টা করি।”
তবে তাঁর জীবনের আরও কিছু দিক রয়েছে।
তাঁর মা গীতা দেবী Deaf Chess-এ রৌপ্যপদক জিতেছেন এবং তিনিই সিমরানকে দাবা খেলতে শিখিয়েছেন। এখন সিমরানও তাঁর মায়ের মতো Deaf Chess-এ রৌপ্যপদক জিতেছেন!
শুধু তাই নয়, তিনি মডেলিংও করেছেন!
বর্তমানে সিমরান সরকারি Staff Selection Commission (SSC) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, “আমি সবসময় নতুন নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার সন্ধান করতে ভালোবাসি।”
 

ছবি:

ভিকি রয়