১৯৯৬ সাল। সাঙ্গীতা বিষ্ণোইয়ের মামার বিয়ের দিন সকাল। রাজস্থানের যোধপুর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের কোসানা গ্রামে তিনি বাবা রামসুখ ও মা ডাকু দেবীর সঙ্গে থাকতেন। সেদিন বৃষ্টির টাপুর-টুপুর শব্দে ভিজে ছিল চারদিক। মাত্র ছয় বছরের সাঙ্গীতা কৌতূহলবশত ছাদে যেতে জেদ ধরেছিল, যদিও তার কাজিনরা যেতে চায়নি। ছাদে উঠে সে একটি ঝুলে থাকা তার দেখতে পেল। সেটিকে দোলনা ভেবে সে হাত বাড়িয়ে দিল।
উচ্চ ভোল্টেজের সেই তার স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার পৃথিবী সাদা হয়ে গেল।
তার দাদু তাকে ভেজা মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। বিদ্যুৎ তার ডান হাত দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে বাম পা দিয়ে বেরিয়ে যায়, রেখে যায় ভয়াবহ দগদগে ক্ষত — আর বদলে দেয় তার পুরো জীবন। পরিবার দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকেরা তার পায়ে দুটি এবং হাতে চারটি অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তার ডান হাত কাঁধ পর্যন্ত এবং বাম পা হাঁটু পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। মানুষ নানা কথা বলতে শুরু করেছিল— কেউ ফিসফিস করে, কেউ প্রকাশ্যেই বলেছিল, “ও বেঁচে না থাকলেই ভালো হতো।” কিন্তু রামসুখ সবাইকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সে আমার কলিজার টুকরো। সারাজীবন আমি ওর যত্ন নেব।”
এক বছর ধরে চিকিৎসা চলার পর সঙ্গীতা ক্রাচের সাহায্যে হাঁটা শুরু করে। পরে তাকে একটি কৃত্রিম ‘ব্লেড’ লাগানো হয়, যা তার চলাফেরায় নতুন গতি এনে দেয়। সে সাধারণ স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে এবং ২০০০ সালে তার বাবা তাকে হোস্টেলসহ একটি বিশেষ বিদ্যালয়, সুচেতা কৃপলানি শিক্ষা নিকেতনে ভর্তি করান। শুরুতে পরিবার থেকে দূরে থাকতে সে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়। হোস্টেলই হয়ে ওঠে তার দ্বিতীয় বাড়ি, আর বাবা-মা প্রতি সপ্তাহে তাকে দেখতে যেতেন। ১৬ বছর বয়সে সে নিজের যত্ন নিজেই নিতে শিখে যায়।
স্কুলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলো শুধুমাত্র ছেলেদের জন্য ছিল। কিন্তু ক্রীড়া প্রশিক্ষক অমর সিং ছোট্ট সাঙ্গীতার মধ্যে বিশেষ প্রতিভা দেখতে পান। মাত্র ১০ বছর বয়সে সে লন্ডন মিনি প্যারা অলিম্পিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উঠে ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাওয়ার্ড’ জেতে। তবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগের অভাবে সে কিছুদিন খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারেনি এবং পড়াশোনায় মন দেয়। সে বি.এ., সমাজবিজ্ঞানে এম.এ. এবং ২০১৩ সালে বেসিক স্কুল টিচিং সার্টিফিকেট সম্পন্ন করে। একই বছর আত্মীয়দের উৎসাহে তার বিয়ে হয়। কিন্তু খুব শিগগিরই সেই সংসারের অন্ধকার দিক সামনে আসে— পণ দাবি, নির্যাতন ও মানসিক যন্ত্রণা। তার বাবা-মা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। ২০১৯ সালে সে শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদ পায়।
এরই মধ্যে ২০১৬ সালে নতুন উদ্যমে সে আবার খেলাধুলায় ফিরে আসে। মরুভূমিতে সাইক্লিং, দৌড়, সাঁতার, ডিসকাস থ্রো, ক্রিকেট— সবকিছুতেই নিজেকে উজাড় করে দেয়। তার কথায়, “দুনিয়াকে কিছু প্রমাণ করার জন্য নয়, নিজেকে জীবন্ত অনুভব করার জন্য।” সে নিয়মিত ম্যারাথন দৌড়বিদ হয়ে ওঠে এবং রাজস্থানে যেখানে ম্যারাথন হয়, সেখানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করে। তার বাড়ি ভরে গেছে ট্রফি ও স্মারকে; দেওয়ালে ঝুলছে নানা রঙের পদক। ১৮তম জাতীয় প্যারা অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার ও ২০০ মিটারে রৌপ্য, ৭ম ও ৮ম রাজ্য প্যারা অ্যাথলেটিকসে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ডিসকাসে স্বর্ণ, ৯ম রাজ্য প্যারা অ্যাথলেটিকসে ২০০ ও ৪০০ মিটারে স্বর্ণ এবং শটপুটে ব্রোঞ্জ জেতে। ২০২৩ সালে সে গোয়ায় অনুষ্ঠিত পার্পল রানেও অংশগ্রহণ করে।
২০২১ সালে সাঙ্গীতা টেকনিক্যাল এডুকেশন বিভাগে জেলা কালেক্টরের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি পান। প্রতিদিন তিনি বিশেষভাবে পরিবর্তিত তিন চাকার স্কুটি চালিয়ে প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অফিসে যান। বর্তমানে তিনি বড় ভাই সুরেশের সঙ্গে থাকেন। তার পরিবারই তার শক্তির মূল উৎস। তার বাবা এখনও চায়ের দোকান চালান এবং আগের মতোই তার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে আছেন।
সাঙ্গীতা অনায়াসে রান্না করেন— এক হাতেই রুটি বেলা, সবজি কাটা, ঘড়ি পরা— সবকিছুই যেন সহজ। তার প্রিয় খাবার বাজরার রুটি, করলা, ডাল-বাটি এবং সাংরি কি সবজি। তিনি বলেন, “অতীত নিয়ে কষ্ট করে লাভ নেই। যখন দেখো তোমার থেকেও কম নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে, তখন বুঝতে পারো তুমি কতটা সৌভাগ্যবান।”