Icon to view photos in full screen

“আমি অনেক আর্ট প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছি, আর বহু বছর ধরে আমি একজন আর্ট শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি।”

আসামে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পালিত তিনটি বিহু উৎসবের মধ্যে বসন্তকালের বিহুতে নানা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা দেখা যায়। ডিব্রুগড়ের ২০ বছরের রূপজ্যোতি গগৈ বিহু প্রতিযোগিতায় ঢোল ও পেপা বাজিয়ে বহু প্রশংসা অর্জন করেছে। তার মা রিজুমনি চেতিয়ার (৫৭) চোখ গর্বে ঝলমল করে ওঠে যখন তিনি ছেলের ট্রফিগুলো দেখেন। কিন্তু তার কান কোনোদিনও ছেলের সুর শুনতে পায়নি।
 
রিজুমনি ও তার বড় বোন বিজুমনি—দুজনেই জন্মগতভাবে শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তারা ক্ষেত্রধর চেতিয়া ও বিনু প্রভা হাজারিকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুজন। বর্তমানে ৮১ বছরের বিনু স্মৃতিচারণ করে বলেন, “খুব ছোটবেলাতেই বুঝতে পারি ওরা শুনতে বা কথা বলতে পারে না। তাই আমরা ENT বিশেষজ্ঞ ডা. বি. আর. দাসের কাছে নিয়ে যাই। তিনি নিশ্চিত করেন যে ওরা বধির। ওদের বড় করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে।”
 
দুই বোনই কাছের নাদেশ্বর চক্রবর্তী হাই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেছিল। কিন্তু শুনতে ও বোঝার অসুবিধার কারণে তারা তৃতীয় শ্রেণির পর আর এগোতে পারেনি।
 
যখন রিজুমনিকে বাল্য ভবনে ভর্তি করা হয়, তখন তিনি খ্যাতনামা শিল্প শিক্ষক প্রয়াত প্রীতি রঞ্জন দাসের কাছে শিল্পকলার শিক্ষা নিতে শুরু করেন। আর সেখান থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তার ছোট ভাই বিতুমনি চেতিয়া বলেন, “আমি সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন ওর সঙ্গে ক্লাসে যেতাম। ও যখন ছবি আঁকা শিখত, আমি তখন টেবিল টেনিস আর ক্যারম খেলতাম।”
 
পরে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্কুল “ব্লেসিং”-এ প্রায় ১৮ বছর আর্ট শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর কিছুদিন তার শিক্ষক প্রীতি রঞ্জন দাস প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে কাজ করেন। তারপর তার পরিচয় হয় জ্যোৎস্না সোনোয়ালের সঙ্গে, যিনি ২০০১ সালে “প্রেরণা প্রতিবন্ধী” সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
 
২০০২ সালে রিজুমনি “প্রেরণা”-য় যোগ দেন, তখন সেটি এখনও NGO হয়ে ওঠেনি, ছিল একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী। সেই বছরের অক্টোবর মাসে সংস্থাটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে অংশ নিয়ে রিজুমনি অসাধারণ শিল্প দক্ষতার পরিচয় দেন। কিন্তু একই সময়ে তিনি ধীরে ধীরে বিষণ্ণতায় ডুবে যাচ্ছিলেন। তার মা বিনু এই বিষয়টি জ্যোৎস্নাকে জানান।
 
জ্যোৎস্না বলেন, “রিজুমনি প্রায়ই তার মাকে বলত যে সে পরিবারের ওপর বোঝা, তার মরে যাওয়াই ভালো। সেই সময় আমরা শুনলাম, এক ব্যক্তি তার ১২ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েকে ব্রহ্মপুত্র নদীতে ফেলে দিয়েছে। এমন ঘটনা শুনে আমরা দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিই যে ‘প্রেরণা’-কে NGO হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে, যাতে রিজুমনির মতো মানুষদের পাশে দাঁড়ানো যায়।”
 
“প্রেরণা”-র এক কর্মশালায় রিজুমনির সঙ্গে পরিচয় হয় পবিত্র গগৈয়ের। পবিত্রও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ছিলেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং একসময় তারা পালিয়ে যান। NGO-র কর্মীরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর রিজুমনিকে বারপাথার গাঁয়ে পবিত্রর বাড়িতে খুঁজে পান। তখন তিনি ঐতিহ্যবাহী হাতবোনা পোশাকে নববধূর সাজে ছিলেন, আর গ্রামের মানুষজন তাদের বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য জড়ো হয়েছিলেন!
 
বিয়ের পর NGO তাদের জীবিকা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। রিজুমনি হস্তশিল্পের কাজে মন দেন, আর পবিত্রকে একটি সেলাই মেশিন দিয়ে ছোট দোকান খোলার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। যদিও দুই শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের সন্তানও বধির হবে—এমন আশঙ্কা ছিল পরিবারের, তবুও তারা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রূপজ্যোতির জন্ম হয় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি নিয়ে।
 
নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে রিজুমনি পবিত্রর জন্য একটি স্কুটারও কিনেছিলেন। ভবিষ্যৎ যেন খুব সুন্দরই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
 
রূপজ্যোতির বয়স তখন মাত্র তিন বছর, যখন পবিত্র এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এই বিশাল শোকের পরও রিজুমনি অসাধারণ মানসিক শক্তির পরিচয় দেন। একা হাতে ছোট ছেলেকে বড় করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি আবার বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন এবং “প্রেরণা”-র সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।
 
২০১৬ সালে জ্যোৎস্না প্রতিষ্ঠিত “প্রেরণা চিলড্রেন হোম”-এ—যেখানে অনাথ ও অসহায় শিশুদের রাখা হয়—রিজুমনি এখন আর্ট ও হস্তশিল্প শেখানোর কাজ করেন। এর জন্য তিনি মাসে ৫,০০০ টাকা উপার্জন করেন। জ্যোৎস্না বলেন, “তার কথা বলার সীমাবদ্ধতা থাকলেও, তিনি আর শিশুরা একে অপরকে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে।” তিনি চান সরকার যেন প্রতিবন্ধী স্বাধীন শিল্পীদের জন্য আর্থিক সহায়তা বা বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যবস্থা করে।
 
পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বড় বোন উষারানি তার স্বামী প্রণব রাজবংশীর সঙ্গে আলাদা থাকেন। ভাই চন্দনও নিজের পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন। অবিবাহিত বিতুমনি ব্যস্ত চৌকিডিঙি মোড়ে একটি ফাস্ট ফুডের দোকান চালান এবং মা, দুই বোন ও ভাগ্নের সঙ্গে থাকেন। বিজুমনি বিয়ে করেননি; তিনি সূচিশিল্পের অর্ডার নিয়ে সামান্য উপার্জন করেন।
 
রূপজ্যোতি এখন লাহোয়াল কলেজের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল বিভাগে পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি সে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরও। নিজের অভিজ্ঞতা ভিডিও করে তুলে ধরতে তার খুব ভালো লাগে। ২০২৫ সালে সে এক বন্ধুকে নিয়ে সাইকেলে করে এক মাসব্যাপী কেদারনাথ যাত্রায় গিয়েছিল, যাকে সে তার জীবনের “সবচেয়ে স্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা” বলে মনে করে।
 
রূপজ্যোতি বলে, “ছোটবেলা থেকেই আমার আর মায়ের মধ্যে খুব বিশেষ একটা সম্পর্ক। ধীরে ধীরে আমরা নিজেদের আলাদা এক ধরনের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করে ফেলেছিলাম।”
 
সে ছোটবেলার একটি মজার স্মৃতিও শেয়ার করে। অন্য সব বাচ্চার মতো সেও ক্রিম বিস্কুটের শুধু ক্রিমটাই খেতে ভালোবাসত। বিস্কুটের বাইরের অংশ চেটে বাড়ির বাইরে ফেলে দিত। এমন ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে একদিন রিজুমনি রেগে যান। তিনি বকাঝকা করেন, এমনকি মেরেও দেন, কারণ ছেলে খাবার নষ্ট করছিল।
 
রূপজ্যোতি হেসে বলে, “আজ যখন সেই স্মৃতির কথা ভাবি, তখন একইসঙ্গে খুব আবেগপ্রবণ আর মজার লাগে। এটা আমাকে মায়ের ভালোবাসা আর শৃঙ্খলার কথা মনে করিয়ে দেয়। খাবার নষ্ট না করার যে শিক্ষা আমি সেদিন পেয়েছিলাম, তা সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকবে।”
 

ছবি:

ভিকি রয়