Icon to view photos in full screen

“ভবিষ্যৎকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে আজকে গ্রহণ করুন, আর এমন কাজ করুন যা আপনাকে আনন্দ দেয়।”

বেঙ্গালুরুর ৪২ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা আগরওয়াল ভারতের দ্বিতীয় দৃষ্টিহীন নারী এবং কর্ণাটকের প্রথম নারী হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছেন। তবে তাঁর জীবনের চড়াই-উতরাইও যেন কোনো অংশে হিমালয় জয়ের চেয়ে কম কঠিন নয়।

প্রিয়াঙ্কার জন্ম কলকাতায়। পরে তাঁর ব্যবসায়ী বাবা পরিবার নিয়ে কেরালার এর্নাকুলামে চলে যান, যেখানে তিনি তাঁর পড়াশোনার বেশিরভাগ অংশ সম্পন্ন করেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রথম সমস্যার লক্ষণ দেখা দেয়। তিনি ক্লাসের শেষ বেঞ্চ থেকে ব্ল্যাকবোর্ড দেখতে পাচ্ছিলেন না। চিকিৎসক তাঁকে চশমা দিলেও পরিবারের কাউকে জানাননি যে তাঁর **রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (RP)** নামের একটি দুরারোগ্য জিনগত রোগ হয়েছে, যার ফলে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি ক্ষয় হতে থাকে।

দশম শ্রেণির মধ্যবর্তী পরীক্ষার সময় হিন্দি প্রশ্নপত্রের প্রশ্নগুলো তিনি প্রায় পড়তেই পারছিলেন না। তবুও কোনোভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৯ সালে চিকিৎসক অবশেষে পরিবারকে জানান যে তাঁর RP হয়েছে। পরিবারের অন্য কারও এই রোগ না থাকায় চিকিৎসকের ধারণা ছিল, এটি সম্ভবত একটি **রিসেসিভ জিনের** কারণে হয়েছে।

প্রিয়াঙ্কা বলেন, “ততদিন পর্যন্ত আমি দেখতে পেতাম, একা চলাফেরা করতাম, বাস-ট্রেনে যাতায়াত করতাম। সাইকেল চালাতে খুব ভালোবাসতাম।” তাঁর পরিবার আশা করেছিল, ভিটামিন-এ এবং প্রচুর গাজর খেলে হয়তো রোগের অগ্রগতি ধীর হবে। কিন্তু ধীরে ধীরে আরও নানা সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে—রাতকানা, রঙ চিনতে অসুবিধা এবং টানেল ভিশন। দ্বাদশ শ্রেণি থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শিক্ষকদের পড়ে শোনাতে হতো।

২০০৪ সালে তিনি কোট্টায়ামের এম.জি. বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম সম্পন্ন করেন। তাঁর এক দিদি চাকরি শুরু করেছিলেন, যা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি বলেন, “আমাদের রক্ষণশীল মারোয়াড়ি পরিবারে মেয়েরা সাধারণত চাকরি করে না। কিন্তু আমিও কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

এরপর তিনি একের পর এক টেলিমার্কেটিংয়ের চাকরি করেন। তাঁর যোগাযোগ দক্ষতার জন্য প্রশংসা ও পুরস্কারও পান। কিন্তু ২০০৭ সালে বাবার ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসে। তিনি নতুন চাকরির চেষ্টা করলেও কল সেন্টারের অভিজ্ঞতা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগছিল না, কারণ সেসব চাকরিতে মাঠে কাজ করতে হতো। ফলে টানা পাঁচ বছর তাঁকে বাড়িতেই থাকতে হয়। এই সময় তাঁর মা তাঁকে রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ শেখান।

২০০৯ সালে এক আত্মীয়ের বিয়েতে তিনি নেপাল যান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় সুরভি নামে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণীর সঙ্গে, যিনি তাঁকে **JAWS** নামে একটি স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার দেখান। বিষয়টি তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করে যে তিনি তাঁর ভাইকে—যিনি তখন হায়দরাবাদে গুগলে কর্মরত ছিলেন—ভারতে এমন কোনো সংস্থার খোঁজ করতে বলেন, যেখানে এই সফটওয়্যার শেখানো হয়। তাঁর ভাই **ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ব্লাইন্ড (NAB)**-এর সন্ধান পান। প্রিয়াঙ্কা সেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তিন মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর তিনি অনলাইনে চাকরির জন্য আবেদন করতে শুরু করেন। দুটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। বহু ধাপের সাক্ষাৎকারে সফল হওয়ার আশায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুই সংস্থাই একই কারণ দেখিয়ে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে—তারা তাদের কম্পিউটার সিস্টেমে JAWS সফটওয়্যার ইনস্টল করতে পারবে না।
সেই দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, “আমি সারা রাস্তা কেঁদেছিলাম। আমি যেন মহাবিশ্বকে বলেছিলাম, আমাকে আর একবার সুযোগ দাও। এক বছরের মধ্যে এর সমান বা আরও ভালো একটি চাকরি দাও।”

এরপর তিনি NAB-এ স্বেচ্ছাসেবার কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। শেখেন, অন্যদের শেখান এবং সাহায্য করেন। পরে **Enable India**-র সঙ্গে যুক্ত হন। বাবা-মাকে রাজি করিয়ে বেঙ্গালুরু গিয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সুযোগ আসে, এবং ২০১২ সালে—ঠিক এক বছর পর—তিনি IBM-এ একটি ভালো বেতনের চাকরি পান।

IBM-এ তাঁর কর্মজীবন দ্রুত এগিয়ে যায়। কাজের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী। প্রতিবন্ধী কর্মীদের নিয়ে গঠিত মূল দলের নেতৃত্ব দিয়ে বহু অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। তাঁর দল দু'বার IBM-এর সেরা দল হিসেবে নির্বাচিত হয়।
২০১৮ সালে তিনি একটি বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। নিজেই অগ্রিম টাকা দেন, ঋণ নেন এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ির নকশা করান। পরিবারের সদস্যরা অবাক হয়ে যান যখন জানতে পারেন, পুরো কাজটাই তিনি একাই করেছেন।
২০১৯ সালের আগস্টে তিনি Dell-এ যোগ দেন, যেখানে বর্তমানে তিনি **প্রোডাক্ট ম্যানেজার** হিসেবে কর্মরত।

এরই মধ্যে তাঁর নতুন বাড়িতে ভালোবাসারও আগমন ঘটে। IBM-এ থাকাকালীন তিনি একটি **Blind Walkathon** আয়োজন করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের টি-শার্ট নিতে এসেছিলেন দিম্পেশ ভাটেওয়ারা (৩৮)। সেখান থেকেই পরিচয়। কোভিডের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও ২০২১ সালে আবার যোগাযোগ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাঁরা বুঝতে পারেন যে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসেন। দিম্পেশের বিবাহবিচ্ছেদ এবং তাঁর পরিবারের প্রবল আপত্তি কাটিয়ে অবশেষে ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর আদালতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

স্বেচ্ছাসেবী জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল **India Inclusion Summit (IIS)**-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া। প্রিয়াঙ্কার ভাষায়, “২০১৫ সালের পর আমি যেন ‘প্রিয়াঙ্কা ২.০’ হয়ে গিয়েছিলাম।”

সেই বছর তিনি প্রথম IIS-এ অংশ নেন এবং সেখানে প্রতিবন্ধী বক্তাদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি বলেন, “এটি আমার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছিল।” পরের বছর তাঁকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়, আর ২০২৫ সালে তিনি একই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হন।

সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় তিন অঙ্গ হারানো অভিযাত্রী **তিনকেশ কৌশিকের** সঙ্গে, যার সংস্থা প্রতিবন্ধীদের জন্য সহজলভ্য অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের প্রচার করে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি প্রতিবন্ধী ও সক্ষম—সবার জন্য একটি ১২ দিনের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকের আয়োজন করেন। এই অভিযানের খবরই প্রিয়াঙ্কাকে আকৃষ্ট করে।
এরপরের ঘটনা এখন ইতিহাস। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে তিনি সেই পাহাড়টিকেই কল্পনা করছিলেন, যা ছোটবেলায় ছবির বই কিংবা সিনেমায় দেখেছিলেন—নিচের অংশ বাদামি বা ধূসর, আর উপরের অংশ বরফে ঢাকা সাদা।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানো তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন ছিল না। জীবনে অর্জন করার জন্য তাঁর কোনো নির্দিষ্ট ‘কীর্তির তালিকা’ও নেই। তিনি বলেন, “এ ধরনের সুযোগ হঠাৎই আমার সামনে আসে, আর ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলে—‘তুমি এটা পারবে।’”

তাঁর এই জীবনদর্শন বিখ্যাত পর্বতারোহী **জর্জ ম্যালোরি**-র সেই ঐতিহাসিক উক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। এভারেস্টে উঠতে কেন চান—এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, **“কারণ, ওটা সেখানে আছে।”**

ছবি:

ভিকি রয়