Icon to view photos in full screen

“আমার স্কুলের বিশেষ শিক্ষাবিদই আমার আদর্শ। আমি তাঁর মতো একজন শিক্ষক হতে চাই”

২০১০ সালের দীপাবলি। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে চারদিকে আতশবাজির ঝলকানি। নির্মাণশ্রমিক এম. নাদুমারান এবং তাঁর স্ত্রী রাজেশ্বরী লক্ষ্য করলেন, তাদের আড়াই বছরের মেয়ে দীপিকা কাছাকাছি আতশবাজি ফাটলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। “সেই প্রথম আমাদের সন্দেহ হলো যে হয়তো ওর কোনো সমস্যা হয়েছে,” বলেন ৪৩ বছর বয়সী নাদুমারান। তিনি আরও বলেন, “ও জন্মের সময় একেবারে স্বাভাবিক শিশু ছিল।” তাঁর ধারণা, ১৮ মাস বয়সে উচ্চ জ্বর কমানোর জন্য দেওয়া ইনজেকশনগুলোর কারণেই হয়তো এই সমস্যা হয়েছে।

দম্পতি তাদের একমাত্র সন্তানকে (তখন) পোর্ট ব্লেয়ারের সরকারি জি.বি. পন্ত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তাররা তার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করে জানান যে একটি “অপারেশন” দরকার, যার জন্য তাদের চেন্নাই যেতে হবে। নাদুমারান বলেন, “আমরা ওকে নিয়ে চেন্নাই গেলাম। সৌভাগ্যবশত সেখানে আমাদের আত্মীয় ছিল, তাই তাদের বাড়িতে থাকতে পেরেছিলাম। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলাম, অপারেশনের খরচ প্রায় ১২ লক্ষ টাকা। তখন ডাক্তাররা আমাদের স্পিচ থেরাপি করানোর পরামর্শ দেন।”

এরপর তারা একটি বেসরকারি ক্লিনিকে যান, যেখানে দীপিকার জন্য একটি হিয়ারিং এইড লাগানো হয় এবং সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ছয় মাসেরও বেশি সময় পরে তারা চেন্নাই থেকে বাড়ি ফিরে আসেন।
প্রথমে তারা বাড়ির কাছের একটি বেসরকারি স্কুলে দীপিকাকে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হননি। পরে নাদুমারান শিক্ষা অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে নিজের সমস্যার কথা জানান। শিক্ষা অধিকর্তার দেওয়া একটি সরকারি চিঠির সাহায্যে দীপিকা বাম্বুফ্ল্যাটের পিএম শ্রী গভর্নমেন্ট সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হতে সক্ষম হয়।

এই স্কুলে রঞ্জন কুমার বিশ্বাস নামে একজন বিশেষ শিক্ষাবিদ আছেন, যিনি সমস্ত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের দেখাশোনা করেন। নাদুমারান বলেন, “এই স্কুলে বধির শিশুদের বাবা-মাকে প্রথমে ভারতীয় সাংকেতিক ভাষা (ISL) শিখতে হয়, যাতে তারা সন্তানদের শেখাতে পারেন। আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনেই ISL শিখেছি। আমরা বাড়িতেও সবাই সাংকেতিক ভাষায় কথা বলি।”

প্রথমদিকে দীপিকার সঙ্গে স্কুলে একজন অভিভাবককে থাকতে হতো। তাই নাদুমারান কাজ ছেড়ে এই দায়িত্ব নেন। কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হওয়ায় তিনি ছয় মাসের বেশি এভাবে চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে তাঁর স্ত্রী রাজেশ্বরী এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দীপিকার একটি ছোট বোন রয়েছে, দামিনি (১৩), যে বর্তমানে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে এবং সেও ISL শিখেছে। এছাড়া তাদের চার বছরের ছোট ভাই রুদ্রাংশও আছে। দামিনি অনেক সময় বড় বোনের মতো দীপিকার যত্ন নিত, স্কুলে তাকে সাহায্য করত এবং প্রয়োজনে বাড়ি ফিরিয়ে আনত।

দীপিকা দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করেছে। যখন EGS-এর সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন সে তার নানীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। তাই তার বাবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি জানান, “দীপিকা ভোরে উঠে পূজা করে। রান্না করতে খুব ভালোবাসে। ইউটিউব বা অনলাইনে ভিডিও দেখে নতুন নতুন রান্না শিখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। আঁকাতেও সে খুব ভালো। গণিত তার প্রিয় বিষয়। আর টিভিতে বিশেষ করে ‘তারক মেহতা কা উল্টা চশমা’ দেখতে খুব পছন্দ করে।”

গর্বিত বাবা আরও বলেন, দীপিকা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। রঞ্জন কুমার বিশ্বাস তাকে বিভিন্ন সভা ও সম্মেলনে নিয়ে যান, যেখানে সে দেখায় যে শ্রবণপ্রতিবন্ধী একজন মানুষও অন্য সবার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলে তার সমস্ত খরচ বহন করা হয় এবং তাকে সম্মানীও দেওয়া হয়।

নাদুমারান বলেন, “আমরা রঞ্জন স্যারের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ। তিনি প্রথম শ্রেণি থেকে দীপিকাকে পড়াচ্ছেন। আজ দীপিকা যা কিছু অর্জন করতে পেরেছে, সবই এই মহান মানুষের জন্য। এখনও তিনি আমাদের এবং দীপিকাকে পথ দেখিয়ে চলেছেন।”
রঞ্জন কুমার বিশ্বাস কোনো সাধারণ শিক্ষক নন। তিনি নিজেও একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার লাভ করেন।

যদিও দীপিকার স্কুলের শিক্ষকেরা তাকে কম্পিউটার ইত্যাদি বিষয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে সে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি পেতে পারে, তবুও তার মন পড়ে আছে শিক্ষকতায়। সে তার প্রিয় শিক্ষকের মতো একজন শিক্ষক হতে চায়।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং পরে বি.এড. (B.Ed.) করা তার স্বপ্ন। আর তার স্নেহময় বাবা-মা আশা করেন, তারা তাদের মেয়েকে এই স্বপ্ন পূরণে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে পারবেন।

ছবি:

ভিকি রয়