EGS-এ আমরা সাধারণত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তাঁদের অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনে থাকি—তাঁরা কীভাবে তাঁদের প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে জীবনযাপন করছেন এবং তা সামলাচ্ছেন। তাই আমরা বেশ হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, যখন ৪৬ বছর বয়সী রোজালিয়া কেরকেট্টা হাসতে হাসতে আমাদের বললেন, “কি বলব? ও তো অন্য সব বাচ্চার মতোই। ওর মধ্যে আলাদা কিছু নেই।” আলাদা কিছু নেই? আট বছরের জয় তো জন্ম থেকেই বধির, তাই না? হ্যাঁ, সে না শুনতে পারে, না কথা বলতে পারে—তবু “ও ঠিকই আছে”—এই কথাটাই তিনি বারবার বলছিলেন। এতে আমাদের ভাবতে হলো—সাধারণভাবে মানুষ প্রতিবন্ধকতাকে কীভাবে এক ধরনের শ্রেণিবিন্যাসে দেখে, যেখানে বধিরতাকে সবচেয়ে কম গুরুতর বলে মনে করা হয়; আর যদি কেউ নড়াচড়া করতে না পারে, হাঁটতে না পারে, দেখতে না পারে, বা মস্তিষ্ক প্রত্যাশামতো কাজ না করে—তাহলে সেটাকে অনেক ‘খারাপ’ বলে ধরা হয়।
রোজালিয়া, তাঁর স্বামী জ়েভিয়ার কেরকেট্টা (৫৩) এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান জয়—তাঁরা উত্তর ও মধ্য আন্দামানের নিলাম্বুর (আরভি) গ্রামের বন দপ্তরের কোয়ার্টারে থাকেন। জ়েভিয়ার জঙ্গলে গিয়ে “একটি হাতির দেখভাল করেন”, আর রোজালিয়া বাড়ির কাজ সামলান। দম্পতিরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব কম।
জয় যখন শিশু ছিল, তখন সে কিছু শব্দ করত; কিন্তু দুই বছর বয়স পর্যন্তও সে না কথা বলায়, না সাড়া দেওয়ায়—তখনই তার বাবা-মা বুঝতে পারেন যে কিছু একটা সমস্যা আছে। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা যায়, সে শুনতে পায় না—এবং তার ফলেই কথা বলতে পারে না। দ্রুতই পরিবারটি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং ইশারার মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে, যা অচিরেই তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়। জয়ের জন্য একটি হিয়ারিং এইড দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার ব্যাটারি প্রায়ই শেষ হয়ে যেত, আর বদলাতে হলে পোর্ট ব্লেয়ার যেতে হতো। শেষ পর্যন্ত তারা সেটি ব্যবহার করাই বন্ধ করে দেয়। জয়ের আশপাশের মানুষজনও ইশারার মাধ্যমেই তার সঙ্গে কথা বলে।
দম্পতি তাঁদের ছেলেকে আরও ‘স্বাভাবিক’ করে তুলতে তিন বছর আগে একটি সাধারণ সরকারি স্কুলে ভর্তি করান। প্রতিদিন সকালে রোজালিয়া জয়কে প্রস্তুত করে—তারপর দু’জনে স্কুলের পথে রওনা দেয়; বাসে গেলে প্রায় পাঁচ মিনিট, হেঁটে গেলে পনেরো মিনিট। তিনি প্রতিদিন তাকে স্কুলে দিয়ে আসেন এবং নিয়ে যান। জয় এখন ক্লাস টু-তে পড়ে, আর রোজালিয়া খুশি যে সে তার বইয়ে “সহজেই ফল, সবজি, পশু-পাখি চিনতে পারে।” তিনি পোর্ট ব্লেয়ারের একটি বিশেষ স্কুলের কথা শুনেছেন, কিন্তু “ওটা বাড়ি থেকে অনেক দূরে”—তাই বিষয়টা নিয়ে বিশেষ ভাবেননি।
উচ্চতর শ্রেণিতে উঠলে তার পড়াশোনার ভবিষ্যৎ কী হবে—এ নিয়ে রোজালিয়া নির্ভার। তিনি শুধু খুশি যে জয় একটি রুটিন মেনে চলে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলে, টিভি দেখতে ভালোবাসে, আর বাইরে গেলে বাবা যে চকোলেট আর আইসক্রিম কিনে দেয়—তা উপভোগ করে। অন্য সব শিশুর মতোই, তাই না? কিন্তু আমরা ভাবতে বাধ্য হই—সে বড় হলে কী হবে, যখন সামাজিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে শারীরিক পরিসর ছেড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে সরে যাবে। সে হয়তো পাঠ মুখস্থ করতে পারবে এবং পরীক্ষা লিখতে পারবে, কিন্তু ভাবনা, ধারণা—এসব কি সে বুঝতে পারবে? শৈশবের খেলাধুলা থেকে জন্ম নেওয়া বন্ধুত্ব টিকে থাকে আবেগীয় বিকাশের মধ্য দিয়ে—আর তার জন্য কথোপকথন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পোর্ট ব্লেয়ারের বিশেষ স্কুলে যদি ভারতীয় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ জানা শিক্ষক থাকেন, তবে তা জয় ও অন্যান্য বধির শিশুদের মধ্যে সত্যিকারের সংযোগ গড়ে তুলতে পারে। সে বধির সম্প্রদায়ের সক্রিয় সদস্য হতে পারে। আবার, তার জন্য কোনটা ‘ভালো’—সে বিষয়ে আমাদের কারও পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়, কিংবা তাকে ‘সমৃদ্ধ হতে না দেওয়ার’ জন্য তার বাবা-মাকে দোষারোপ করাও ঠিক নয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে সে হয়তো ক্রমেই একাকিত্বের মুখোমুখি হবে, আবার নিজের সঙ্গেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে। পড়াশোনার পথ সংক্ষিপ্ত হলেও, সে হয়তো শারীরিক শ্রমে নিজেকে যুক্ত করবে—প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে, নিজের মতো করে সুখ খুঁজে নেবে। জয় হয়তো অপ্রত্যাশিত পথেই আনন্দ খুঁজে পাবে। শেষ পর্যন্ত, সে হয়তো সত্যিই আলাদা হয়ে উঠবে।