Icon to view photos in full screen

“আমি মডেলিং ক্লে দিয়ে কাজ করতে খুব ভালোবাসি! নতুন, অপরিচিত খাবার খেতে আমার ভালো লাগে না।”

২০১৮ সালের একদিন, শীলা বাসন্তী রুটি বানানোর জন্য আটা মাখছিলেন। তখন তাঁর সাড়ে তিন বছরের ছেলে রোনক একটু আটা চাইলে তিনি তাকে এক টুকরো আটা দেন। অবাক হয়ে দেখেন, রোনক সেই আটা দিয়ে ইংরেজি বর্ণমালার অক্ষর বানাতে শুরু করেছে! ঘটনাটি স্মরণ করে শীলা (৪২) বলেন, “সেই সময়ই আমরা বুঝতে পারি যে ওর অক্ষরের আকার নকল করার প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে।”
 
২০১৮ সালটি শীলার জন্য খুব কঠিন ছিল। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি তাঁর মাকে হারান এবং একই বছরে রোনকের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) ধরা পড়ে। অনেক অটিস্টিক শিশুই তাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে যা অনুভব করে (শব্দ, স্পর্শ, গন্ধ ইত্যাদি), তার প্রতি অতিসংবেদনশীল হয়। রোনকের একটি সংবেদনজনিত বৈশিষ্ট্য হলো নরম বা নমনীয় জিনিস নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসা। আজও ১২ বছর বয়সে সে প্লাস্টিসিন (মডেলিং ক্লে) দিয়ে অক্ষর গড়তেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়—আর তা পাঁচটি ভাষায়!
 
আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারের বাসিন্দা শীলা ও তাঁর স্বামী ডি. দিলেশ্বর রায় (৪৫) আগে কখনও ‘অটিজম’ শব্দটি শোনেননি। শীলা আগে একটি স্কুল ক্যান্টিনে বাসন মাজতেন (রোনকের দেখাশোনার জন্য তিনি ১০ বছর আগে চাকরি ছেড়ে দেন) এবং দিলেশ্বর, বর্তমানে নৌবাহিনীর ক্যান্টিনে রান্নার কাজ করেন, আগে একটি হোটেলে কাজ করতেন। রোনকের জন্ম ২০১৪ সালের অক্টোবরে গারাচর্মা সরকারি হাসপাতালে।
 
তিন বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁরা রোনককে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই সে লাগাতার চিৎকার করতে থাকে। ডাক্তার তাঁদের একের পর এক প্রশ্ন করেন—“সে কি কথা বলে?” “অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলে?” প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ছিল “না”। শিশুটির চরম অস্বস্তি, অতিসক্রিয়তা ও পুনরাবৃত্ত আচরণ লক্ষ করে ডাক্তার তাঁদের বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (নিমহ্যান্স)-এ যেতে বলেন। সেখানে রোনকের আনুষ্ঠানিকভাবে ASD নির্ণয় হয় এবং পরিবারটি প্রায় ১৫ দিন সেখানে থাকে। এই সময়ে বাবা-মাকে দৈনন্দিন প্রশিক্ষণ, শেখার পদ্ধতি ও আচরণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশ দেওয়া হয়।
 
ফিরে এসেই শীলা ও দিলেশ্বর নিমহ্যান্সের নির্দেশিকা অনুসরণ শুরু করেন। শিক্ষামূলক ভিডিও ব্যবহার করে বাড়িতেই প্রশিক্ষণ চালু থাকে। বিকাশজনিত দেরির কারণে রোনকের স্কুলে ভর্তি দেরিতে হয়। সে বাথু বাসতির সরকারি সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ে, যেখানে তার দিদি কাব্যা পড়াশোনা করে; বর্তমানে রোনক ক্লাস ৪-এ এবং কাব্যা বিজ্ঞান শাখায় ক্লাস ১২-তে পড়ছে। রোনক ব্রুকশাবাদে কম্পোজিট রিজিওনাল সেন্টারে থেরাপি সেশনে অংশ নিয়েছে। শীলা বলেন, “বিশেষ শিক্ষিকা যোগাবতী রোনকের পড়াশোনায় অনেক সাহায্য করেছেন এবং আমাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছেন। ওর নিয়মিত অকুপেশনাল থেরাপি দরকার, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাড়ির কাছে কোনও থেরাপি সেন্টার নেই।”
 
অপরিচিত পরিবেশে রোনক অস্বস্তি বোধ করে এবং জোরে শব্দ হলে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। সে নতুন খাবার চেষ্টা করতে চায় না; পরিচিত খাবারেই থাকতে পছন্দ করে। মাছের ঝোল আর ইনস্ট্যান্ট নুডলস তার সবচেয়ে প্রিয়। সামাজিক মেলামেশা সীমিত, স্কুলে সে মাত্র একজন বন্ধুর নাম বলে—আদর্শ। তার কথা বলার ক্ষমতা কিছুটা অস্পষ্ট এবং সাধারণত দুই-তিনটি শব্দে সীমাবদ্ধ, যেমন “আমার খাবার চাই” বা “জল চাই”; তবে শীলা বলেন, মৌলিক গণিতে সে ভালো।
 
বাড়িতে রোনক কার্টুন দেখতে খুব উপভোগ করে (“মিস্টার বিন” তার প্রিয়), আর সিনেমার মধ্যে “সিক্রেট সুপারস্টার” ও “ভুল ভুলাইয়া” তার পছন্দ। তার বাবা-মা তাকে নানা ধরনের কাজের সুযোগ দিয়েছেন—আঁকা, নির্মাণের ব্লক, বল আর কাগজের কাপ দিয়ে খেলা (একটি উল্টো কাপের ওপর থেকে আরেকটিতে টোকা দেওয়া), ইত্যাদি। কিন্তু তার সর্বকালের প্রিয় হলো প্লাস্টিসিন। শীলা বলেন, “ও বিভিন্ন ভাষায় শব্দ নকল করে অক্ষর বানাতে ভালোবাসে—ইংরেজি, হিন্দি, তেলুগু, তামিল, মালয়ালম। একবার ইউটিউবে একটি তামিল কবিতা দেখছিল, যেখানে লাইনের সঙ্গে ক্যাপশন ছিল। ও পুরো চার লাইনের কবিতাটাই নকল করে ফেলেছিল!”
 
মনে হয়, রোনকের ভেতরে কিছু বিশেষ দক্ষতা লুকিয়ে আছে, যা আবিষ্কারের অপেক্ষায়। আর যেহেতু তার বাবা-মা তাকে সেরা করে তুলতে সবকিছুই করছেন, তাই হয়তো খুব শিগগিরই আমরা তা জানতে পারব।

ছবি:

ভিকি রয়