অঙ্কিতা মণ্ডল (১৭) তার পরিবারকে বারবার অনুরোধ করছে তাকে পোর্ট ব্লেয়ার স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে। চলাফেরা, দৃষ্টি ও শেখার ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও খেলাধুলার প্রতি তার উৎসাহ একটুও কমেনি। (নিয়মিত পাঠকেরা হয়তো আন্দামানের পদকজয়ী প্যারা অ্যাথলিট এম. ভাবানির কথা মনে করতে পারবেন, যিনি ওই স্টেডিয়ামেই প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলাধুলার প্রশিক্ষণ দেন।) অঙ্কিতার মা নীলম মেয়ের টলমল করে হাঁটার ভঙ্গি বোঝাতে গিয়ে বলেন, তা নাকি “মাতাল মানুষের মতো।” কিন্তু অঙ্কিতার তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। “আমার দৌড়াতে সবচেয়ে ভালো লাগে,” সে আমাদের বলে। সে পদক জয়ের জন্য দৌড়ায় না, কেবল দৌড়ানোর আনন্দের জন্যই দৌড়ায়—যেমনটা সে টিভিতে শোনা গানের তালে নাচতেও উপভোগ করে।
এই হাসিখুশি কিশোরীটি বড় হচ্ছে এক যৌথ পরিবারে, যেখানে নারীদের আধিপত্য রয়েছে—কারণ তার বাবা অভিরাম ২০১৫ সালে মারা গেছেন। মায়ের পাশাপাশি রয়েছে তার ছোট বোন আকশতা (১৫), বাবার বোন দীপালি এবং দুই দিদিমা রিনা ও মালতী। অভিরামের ছোট ভাইয়ের পরিবারও একই বাড়িতে থাকে, আর অঙ্কিতা তার সাত বছরের কাজিন রাজেশের খুব কাছের। “রাজেশের সঙ্গে থাকলেই ও সবচেয়ে খুশি থাকে,” বলেন নীলম। “ও সব সময় ওর পাশেই থাকে—খাওয়ায়, ঘুরিয়ে আনে।”
নীলম “একটি বেসরকারি কাজ” করেন (কাজের প্রকৃতি বলতে তিনি ইতস্তত করছিলেন) এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, “ক্লাস থ্রি পর্যন্ত অঙ্কিতা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। ওর ১১ বছর বয়সে স্কুলে একটা ইনজেকশন দেওয়া হয়। জিজ্ঞেস করলে বলেছিল পোলিওর জন্য। সেই দিনের পর থেকেই আমি ওকে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছি।” তার দাবি, ওই ইনজেকশনের ফলে অঙ্কিতার পা দুর্বল হয়ে যায় এবং চোখেরও ক্ষতি হয়।
হাসিখুশি ভঙ্গিতে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অঙ্কিতা জানায়, “আমার স্কুলে যেতে ভালো লাগে, আমার অনেক বন্ধু আছে। আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু শ্রিষ্টি আর শ্রেয়া। আমার প্রিয় বিষয় ইংরেজি, হিন্দি আর আর্ট। স্কুল থেকে ফিরে আমি মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করি।” সে এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে এবং বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। উচ্চশিক্ষার বিষয়ে সে এখনো খুব একটা ভাবেনি; আপাতত তার লক্ষ্য সিনিয়র সেকেন্ডারি শেষ করা। নীলম বলেন, “কখনো কখনো ও বলে বাইরে কোথাও পড়তে যেতে চায়, কিন্তু যে মেয়ে ঠিকমতো স্থির হয়ে হাঁটতেও পারে না, তাকে আমরা কীভাবে দূরে পাঠাব? আমার স্বপ্ন ছিল ও স্বনির্ভর হবে, কিন্তু সেটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।”
অঙ্কিতা অবশ্য মায়ের এই আশঙ্কাগুলো ভাগ করে নেয় না। জীবনের ছোট ছোট জিনিসেই সে খুশি—স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে থাকা, সিনেমা আর কার্টুন দেখা, ফোনে খেলা, মাটন গোস্ত খাওয়া। দীর্ঘক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকতে তার ভালো লাগে না; বাইরে যেতে সে খুব ভালোবাসে—কোথায় যাচ্ছে সেটা বড় কথা নয়, বাইরে হলেই হলো।
নীলম বলেন, মেয়ে এখন আরও জেদি হয়ে উঠেছে। “ও এখন আলাদা রকমের হয়ে গেছে। ওর আচরণ আগাম বোঝা যায় না। ও চায় সবকিছু ওর ইচ্ছেমতো হোক, আর আমাদের সেটাই করতে হয়।” কথাগুলো অভিযোগের মতো শোনালেও, হয়তো এতে ভালো দিকই আছে—অঙ্কিতা নিজের কথা জোর দিয়ে বলতে শিখছে। হয়তো এটাই তার নিজের মতো করে একটি জীবন গড়ে তোলার দৃঢ়তার লক্ষণ।