Icon to view photos in full screen

“আমি পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলা আর নাচতেই বেশি ভালোবাসি। চার্চে আমরা যে গান গাই, সেগুলো আমার খুব ভালো লাগে।”

ফাঁকাওয়ালা দাঁত আর টোল পড়া গালের হাসি যেন সবসময় লেগেই থাকে তার মুখে। আন্দামানের সিপ্পিঘাটের ১০ বছরের আভাস মিনজ সারাক্ষণই কোনো না কোনো সুর গুনগুন করে, আর তার হাসিতে পুরো বাড়িটাই আনন্দে ভরে ওঠে—এমনটাই বলেন তার মা আনসোসনা কেরকেট্টা (৪১)। অথচ তার জন্মের সময়টুকু ছিল ভীষণ উদ্বেগ আর টেনশনে ভরা।
 
ডাউন সিনড্রোমের কারণে অতিরিক্ত একটি ক্রোমোজোম নিয়ে জন্ম হয়েছিল আভাসের l সে জন্মেছিল মাত্র ছয় মাসে। জন্মের পর তাকে দুই মাস NICU-তে থাকতে হয়েছিল। পরে তার অন্ত্রে জটিলতা দেখা দিলে মাত্র তিন মাস বয়সে ডাক্তারদের অস্ত্রোপচার করতে হয়।
 
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দা আনসোসনা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী। ২২ বছর বয়সে তিনি কুলদীপ মিনজকে বিয়ে করেন। কুলদীপ পুলিশ বিভাগে কাজ করেন। তাদের বড় ছেলে অভয়, এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। কুলদীপের কাজের সময় অনেক দীর্ঘ এবং প্রায়ই তাকে অন্য জায়গায় বদলি হতে হয়, তাই অভাষের প্রধান দেখভালের দায়িত্ব আনসোসনার ওপরই থাকে। তবে তিনি সামলে নিতে পারেন, কারণ তার কথায়, “আমার পরিবার সবসময় আমাকে সমর্থন করেছে।” তিন বছর আগে তারা পুলিশ কোয়ার্টারে এসে ওঠেন।
আভাস কথা বলতে পারে না, কিন্তু নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। তার মা বলেন, “আমি ওকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করাতে চাইনি। ভয় ছিল, ওকে হয়তো অন্য বাচ্চারা বিরক্ত করবে আর শিক্ষকরা যথেষ্ট মনোযোগ দেবেন না।” তাই এমন আশায় যে একটি বেসরকারি স্কুলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ পাওয়া যাবে—যেখানে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবন্ধী শিশুকে আপন করে নেবে—তিনি তাকে ভাথু বস্তির কাছের আনন্দ মার্গ প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করান। সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল, তা খুব দ্রুতই বোঝা যায়।
 
এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অভাষ তার সহপাঠীদের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই মিশে গেছে। আনসোসনা বলেন, “ও সবাইকে ভালোবাসে, আর ওর বন্ধুরাও ওর সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করে। ক্লাসে শিক্ষিকা ওকে নিজের পাশেই বসান। পরীক্ষার সময় শিক্ষকরা আমাকে প্রশ্ন দিয়ে দেন, আমি বাড়িতে ওকে শেখাই। আবার উত্তর লেখার সময় ওর হাতও ধরে সাহায্য করেন।”
 
তবে পড়াশোনায় তার খুব একটা মন নেই। খেলাধুলা, গান গাওয়া, নাচ আর এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতেই তার বেশি ভালো লাগে। পাড়ার অন্য বাচ্চাদের সঙ্গেও সে খেলাধুলা করে। তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আভ্যান।
 
তার মা বলেন, “ও আমাদের একদমই বিরক্ত করে না, যদিও মাঝে মাঝে খুব চঞ্চল হয়ে যায়। আর দুষ্টুমিও কম করে না!” অভয় জানায়, স্কুলে তার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ভূগোল। সে ইশারার মাধ্যমেই আভাসের সঙ্গে কথা বলে। “আমি আমার ভাইকে খুব ভালোবাসি,” সে বলে। বড় হয়ে বাবার মতো পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখে অভয়। আর আনসোসনার ইচ্ছে, অভয় যেন ভালো চাকরি পায় এবং ভবিষ্যতে বাবা-মা না থাকলে ভাইয়ের দেখাশোনা করে।
 
অন্য সব বাচ্চাদের মতো আভাসও সবজি খেতে খুব বায়না করে। তার মাকেই খাইয়ে দিতে হয়। তবে মাছ বা মুরগি দিলে সে খুব আনন্দ করে নিজেই খেয়ে নেয়! আনসোসনা বলেন, “প্রতি রবিবার প্রার্থনার জন্য চার্চে যেতে ও খুব ভালোবাসে। চার্চে আমরা যে গান গাই, সেগুলো ওর খুব প্রিয়। সারাক্ষণই কোনো না কোনো সুর গুনগুন করতে থাকে।”
 
তাদের একই কোয়ার্টারের ওপরের তলায় আরেকটি পরিবার থাকে, যাদের সন্তানও প্রতিবন্ধী। আনসোসনা বলেন, “এলিনর দুই বছর আগে এখানে এসেছে। তার স্বামী এডউইনও পুলিশ বিভাগে কাজ করেন। আমাদের বাচ্চারাও বন্ধু।”
 
অপেক্ষায় থাকুন এডউইন ও এলিনরের ছেলে এলেশন সুলতানের গল্প শোনার জন্য…
 

ছবি:

ভিকি রয়